কী অবস্থায় কোটি টাকার ‘কাঁটা’

৩৬ নম্বর ভূতের গলিতে গিয়ে পাওয়া গেল কবি টোকন ঠাকুরকে। পুরান ঢাকার বহু পুরোনো দুটি বাড়ির মাঝখানে আবর্জনার নিচে চাপা পড়েছিল গলিটি। স্থানীয় পঞ্চায়েতপ্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সহযোগিতা নিয়ে ‘ভূতের হাত থেকে’ গলি উদ্ধার করেছেন তিনি। এক গাড়ি পুলিশ নিয়ে এসেছিলেন, যাতে ‘ভূতেরা’ (কেউ) কোনো ‘ঝামেলা’ করতে না পারে। তারপর সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। মাঝে মাঝে ফেসবুকে ছবি আপলোড করছেন। কাহিনি কী?
পুরান ঢাকার নারিন্দার ওই বাড়িটায় থাকতেন ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন। বিরাট বাড়িটিকে জমিদার বাড়ি বলে চালিয়ে দিলে আজকের প্রজন্ম অবিশ্বাস করবে না। বহু বছর পড়ে থাকতে থাকতে একরকম ভূতের বাড়িই হয়ে গেছে সেটা। সামনে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তোলা কাঠের দরজাজোড়া খোলাই থাকে। সন্ধ্যার পর অসীম সাহসী কোনো তরুণ বাড়িটার ভেতরে ঢোকার সাহস করেন না। সেখানেই আস্তানা গেড়েছেন নব্বই দশকের কবি টোকন ঠাকুর। খোঁজখবর নিয়ে গত শুক্রবার সকালে ওই ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ি বাড়িটার ভেতরে।
উঠানে একটা জট পাকানো বটগাছ আলো আটকে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে কাঁধ নাড়ছে। বাড়ির নিচতলার বারান্দায় এক কিশোরীকে এক ঝলক দেখা যায়, তারপর উধাও। বারান্দার বাঁ পাশের একটা ঘরের ভেতরের টেবিলে একগাদা কাগজ, আইসক্রিমের বাটিভর্তি ওষুধ। দেয়ালে ৪০ বছরের পুরোনো এক সিনেমার পোস্টার। সাদা পায়জামা ও হলুদ টি-শার্ট পরা টোকন ঠাকুর খাটের ওপর শুয়ে ছিলেন। তাঁকে নিয়ে বাতাসে গুঞ্জন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাওয়া অনুদানের টাকা খরচ করে বসে আছেন। ছবির কাজ এতটুকুও করতে পারেননি। অনেকগুলো চিঠি পাঠিয়েছে সরকার, জবাবও দেননি।
‘কাঁটা’ ছবির দৃশ্যে গজেন্দ্র গমন ও কায়েস চৌধুরী‘কাঁটা’ ছবির দৃশ্যে গজেন্দ্র গমন ও কায়েস চৌধুরী

ভূতে পাওয়া টোকন ঠাকুর
কবি টোকন ঠাকুরকে ভূতে পেয়েছে। শহীদুল জহিরের ভূত। পুরান ঢাকার ভূতের গলিতে লেখক শহীদুল জহিরের জন্ম। তাঁর ‘কাঁটা’ গল্প নিয়ে সিনেমা, তাই নারিন্দায় নিজেই একটা ভূতের গলি রচনা করে বসেছেন পরিচালক। সেই গলির এক পোড়োবাড়িতে আটকে আছেন পাঁচ মাস। ঠিক যেমনটি ‘কাঁটা’ গল্পে ঘটেছিল, পুরান ঢাকার মানুষদের জীবন থমকে গিয়েছিল একটি কুয়াকে ঘিরে। টোকন ঠাকুর ও একদল চলচ্চিত্রকর্মীর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ২২ পৃষ্ঠার গল্প কাঁটা থেকে তৈরি করেছিলেন দেড় শ পৃষ্ঠার। শুটিং হচ্ছে ২৬তম বারের সম্পাদিত চিত্রনাট্যে। এই মুহূর্তে ‘হচ্ছে’ বললে অবশ্য ভুল হবে। থামকে আছে ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’। শুটিং শুরুর অপেক্ষায় আছে।

আড়াই শ অভিনয়শিল্পীর ‘কাঁটা’
কাঁটায় অভিনয় করেছে একটি বিড়াল। পুরান ঢাকার সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অভিনেতা বিড়ালটি প্রায়ই কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যায়। শুটিংবাড়িতে ইলিশ ভাজার গন্ধ পেলে চলে আসে। ১৯৬৪, ১৯৮৯-৯০ এবং ১৯৭১ সালে ওই বাড়িতে যেসব ঘটে, বিড়ালটি তার সাক্ষী। বাড়িওয়ালা আবদুল আজিজ ব্যাপারী বেড়ালটিকে বস্তায় ভরে দূরে ফেলে আসার জন্য একজন লোককে ডেকে পাঠান। খাকি ইউনিফর্ম পরা রহস্যময় লোকটির নাম ‘অ্যালান পো’। তিনি কদিন আগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ‘কাঁটা’র লোকেরা কেরানীগঞ্জ কারাগারে তাঁর সঙ্গে জন্য সিগারেট আর বিস্কুট দিয়ে এসেছেন। মুক্ত হয়ে এলে আরও দুটি শট আছে তাঁর।
‘কাঁটা’য় অভিনয় করেছেন আড়াই শ অভিনয়শিল্পী। তাঁদের মধ্যে সুবোধ ও স্বপ্নাই আছে চার জোড়া। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা ওই বাড়িতে আশ্রয় নিতে আসে এবং কুয়ায় ডুবে মারা যায়। এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন অচেনা কতগুলো মুখ, যাঁদের কখনোই পর্দায় দেখা যায়নি। ছবির প্রস্তুতি চলাকালীন আড়াই শ শিল্পীকে নিয়ে দেড় শ সিনেমা দেখেছেন পরিচালক।
‘কাঁটা’ ছবির দৃশ্যে অনিমেষ আইচ, তৃপ্তি রাণীসহ আরও অনেকে‘কাঁটা’ ছবির দৃশ্যে অনিমেষ আইচ, তৃপ্তি রাণীসহ আরও অনেকেছবিতে মুচির ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রীমন্ত বসু নামের এক তরুণ। নিচু স্বরে মাথা নুয়ে মাটিতে চোখ রেখে কথা বলছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিস্মিত হই। পরিচালকের কাছ থেকে জানতে পারি, এভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছে তাঁকে। রীতিমতো নির্যাতন চালানো হয়েছে। নিয়ম করে একটা ঘরে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হয়েছিল। মুচির ছেলের অভিনয় করতে যাচ্ছ, সে কেন চোখ তুলে কথা বলবে? ভাত প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ছেলেটির। শুকিয়ে এখন গ্রাফিতির সুবোধের মতো হয়ে গেছেন তিনি।

নায়িকার ১৩তম জন্মদিন
১২ বছর বয়সে ‘কাঁটা’য় কাজ করতে আসে তিস্তা নদী। শুটিং সেটে পালিত হয় তাঁর ১৩তম জন্মদিন। তাঁকে বলা হয়েছে, কবরীর বয়স যখন ১৩, তখন তিনি বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে এসেছিলেন। তিনি বিখ্যাত হয়েছেন, তুমিও পারবে। তিস্তা জানতে চেয়েছিল, এই সিনেমায় কাজ করলে কলকাতার নায়ক দেবের সঙ্গে দেখা হবে? পরিচালক টোকন ঠাকুর তাঁকে কথা দিয়েছেন, ‘কলকাতায় ছবিটার গ্র্যান্ড ওপেনিং হবে। তুই দেবের পাশে বসে সিনেমা দেখবি।’

সুবোধ-স্বপ্নার মৃত্যুকূপ
নাসিরউদ্দিন নিশ্চয়ই ভাবেননি, বহু বছর পর তাঁর বাড়ির পেছন দিকটাই প্রবেশ পথ হয়ে যাবে। আবারও সেটি হয়ে উঠবে হিন্দুবাড়ি। কুয়া উঠবে, একটি তুলসীগাছ লাগানো হবে, সুবোধ-স্বপ্নার ঘরে এসে ঠাঁই নেবে ঠাকুরের মূর্তি। বাড়ির ছাদে আবারও কবুতরের ঘর হবে, সেগুলোর আলোক স্নানের জন্য মাচা তৈরি হবে। আর এক পাগল নির্মাতা ছবি বানানোর জন্য জংলা সরিয়ে এসে আস্তানা গাড়বেন তাঁর বাড়িতে।
শহীদুল জহিরের ‘কাঁটা’ গল্পে সময় আটকে যায়। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা। সেই দাঙ্গার জেরে সুবোধ-স্বপ্নাকে কুয়ায় ডুবিয়ে মারা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একই ঘটনা ঘটে নতুন সুবোধ-স্বপ্নার জীবনে। ১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার জের ধরে ওই বাড়িতে আবারও একই ঘটনা ঘটে। চক্রাকারে একই ঘটনায় ক্ষুব্ধ মহল্লাবাসী কুয়াটি ভেঙে দিতে আসে। সেই কুয়াটি নতুন করে খনন করেছেন পরিচালক।
পরিচালকের সঙ্গে তিস্তা নদীপরিচালকের সঙ্গে তিস্তা নদী

ট্রাংকের ভেতরে ২১৩টি শাড়ি
‘বহু মানুষের ভালোবাসার দান রয়েছে এই ছবির জন্য’, বিরাট একটা ট্রাঙ্কের ডালা তুলে ধরে সেই দান দেখালেন টোকন ঠাকুর। ছবিতে ব্যবহার করার জন্য ২১৩টি নতুন শাড়ি দিয়েছেন দেশালের সুহৃদ শিল্পী ইসরাত জাহান ও বন্ধু কনক আদিত্য, দেশালের পক্ষ থেকে। ১৯৬৪ সালের কাঁসার ঘটিবাটি তো আছেই, অনেক অভিনেতা নিজেদের প্রপস নিজেরাই এনেছেন। ‘অনিমেষ আইচ তাঁর “ভয়ংকর সুন্দর” ছবির একগাদা প্রপস আমাকে দিয়ে দিয়েছে। ১৯৬৪ সালের ছবি ‘সংগম’, ‘সুতরাং’ ছবিগুলোসহ ১৯৮৯ সালের বেশ কিছু ছবির প্রায় ৪০টি পোস্টার নতুন করে ছাপানো হয়েছে। এই ছবিতে সাংবাদিকতাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই সময়ের দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক বাংলাসহ অনেকগুলো পত্রিকা নতুন করে ছাপানো হয়েছে। এত কিছুর পর যদি ছবিটা শেষ করতে না পারি, সেটা হবে দুঃখজনক। শরীরের অবস্থা ভালো না। সপ্তাহে ৮৪টা ট্যাবলেট খেতে হচ্ছে, কার্ডিয়াক বেজড্।’

 

‘কাঁটা’ ছবির একটি দৃশ্য

 

কোটি টাকার ‘কাঁটা’
অনুদানের ১০ লাখ টাকা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। বাকি ২৫ লাখ পাওনা আছে। পরিচালকের ভাষায়, ‘ছবি শেষ না করে মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছি না। কিছু স্বজন-বান্ধবের সহযোগিতায় এত দূর এসেছি। এখন আড়াই শ জনকে নিয়ে একরকম ইথিওপিয়ার মধ্যে আছি। এক কোটি টাকার নিচে এ ছবি হবে না। বেতনভুক্ত এডিটর, এত বড় টিমের খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, চা—সব মিলিয়েই তো বিরাট খরচ। এখানেই এডিটিং করা হয়। বারবার কোথায় যাব এডিট করতে? সময় যাবে, সিএনজি ট্যাক্সির ভাড়া যাবে। তার থেকে এখানেই এডিটিং প্যানেল করেছি। ঘুম থেকে উঠে কাজ করি, ঘুমাতে যাওয়ার আগে কাজ করি। ৭০ শতাংশ কাজ আড়াই ঘণ্টার মতো হয়েছে। আরও ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ফুটেজ আছে। সবটা কেটে-কুটে টাইট করে মোট আড়াই ঘণ্টায় নামাতে হবে। কাটতে ভীষণ কষ্ট হয়, মনে হয় নগদ টাকা কেটে কেটে ফেলে দিচ্ছি। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে ১১টা পদাবলি ও ভজনগীত আছে।’
‘কাঁটা’ ছবির একটি দৃশ্য

ছবি হবে, নাকি ঝুলে থাকবে?
২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পায় প্রয়াত তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘কাগজের ফুল’। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ছবিটির কাজ আর শুরু হয়নি। নারগিস আক্তারের ‘যৈবতী কন্যার মন’ এখনো মুক্তি পায়নি। তবে মুক্তি পেয়েছে আকরাম খানের ছবি ‘খাঁচা’।
নির্মাণ শেষে ‘কাঁটা’ বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন কী যুক্ত করবে? পরিচালক বলেন, ‘আমাদের “কাঁটা” একটা পিরিওডিক্যাল ছবি। ষাটের দশকের ঢাকাকে দেখা যাবে এখানে। ছবিতে ভবিষ্যৎ বর্তমানের ভেতর দিয়ে অতীতে প্রবেশ করবে। এ রকম ছবি ঢাকায় আগে বানানো হয়নি। এত চাপ কে নেবে? কেন নেবে? এই ছবি বানাতে গিয়ে আমাকে যেসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেগুলো চাপা থাকবে না। সবাইকে জানিয়ে দেব।’

পরিচালকের ইচ্ছা, নভেম্বর-ডিসেম্বরে সেন্সরে পাঠাবেন ছবিটি। জানুয়ারিতে মুক্তি। যদি সব ঠিকঠাক থাকে।

‘কাঁটা’র শুটিং চলছিল যখন

‘কাঁটা’র শুটিং চলছিল যখন

 

বি:দ্র: মূল নিউজটি প্রথম আলো’র

Write a comment