চলচ্চিত্রের বিকল্প প্রযোজনা ও পরিবেশনা, একটি পর্যালোচনা

সারাবিশ্বেই এখন স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা দর্শকের কাছে পৌঁছাতে বিকল্প পরিবেশনার দিকে ঝুঁকছেন। আর এই বিকল্প পরিবেশনার মাধ্যমে শুধু নিজ দেশেই নয়- পৌঁছানো যায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও। সিনেমা হলে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য খুব কঠিন একটা ব্যাপার। সিনেমা হলে মুক্তির জন্য যে পরিমাণ খরচ প্রয়োজন তা একজন স্বাধীন নির্মাতার পক্ষে বহন করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

খুব সম্প্রতি ভারতের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের দিকে আমরা যদি তাকাই- তাহলে দেখা যাবে যে-স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখন আধুনিক এবং নতুন পন্থায় চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং পরিবেশনার কথা ভাবছে। বলতে গেলে চলচ্চিত্র উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা শব্দটি এখানে এ কারণে প্রযোজ্য যে- চলচ্চিত্র নির্মাণে যে ধরণের পুঁজি প্রয়োজন তা তারা নিজেরাই সংগ্রহ করছেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষে চলচ্চিত্রটি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছেন।

কীভাবে সম্ভব? খুব সহজ উত্তর।

ভিডিও অন ডিমান্ড। আজকাল ভিওডি শব্দটির সঙ্গে কমবেশি সবাই পরিচিত। ডিজিটাল প্লাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে কনটেন্ট দেখার নতুন এই পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে দিন দিন। দুধরনের ভিওডি প্রচলিত। এক, সাবস্ক্রিপশন ভিওডি। দুই, ট্রান্সজেকশনাল ভিওডি।

সাবস্ক্রিপশন ভিওডি: এ পদ্ধতিতে নির্মাতারা তাদের কনটেন্ট একটি জায়ান্টকে বিক্রি করে দেয়। দর্শক সেই প্লাটফর্মে সাবস্ক্রাইব করে চলচ্চিত্রগুলো দেখতে পারেন। সারা বিশ্বে নেটফ্লিক্স এই জায়ান্টের মধ্যে অন্যতম। সম্প্রতি ভারতে নেটফ্লিক্স তার কার্যক্রম কাজ শুরু করেছে। এছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নেটফ্লিক্স জনপ্রিয়। নেটফ্লিক্স ছাড়াও আমাজনের প্রাইম ভিডিও একই পদ্ধতিতে নির্মাতাদের কাছ থেকে কনটেন্ট কিনে নিয়ে দর্শকের কাছে সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে পরিবেশনা করে থাকে। নেটফ্লিক্স বা আমাজনের প্রাইম ভিডিও ছাড়াও অনেক লোকাল প্লাটফর্ম একই পদ্ধতিতে কনটেন্ট পরিবেশনার কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি বায়োস্কোপ বা আইফ্লিক্স উল্লেখযোগ্য।

দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ট্রান্সজেকশনাল ভিওডি: নির্মাতারা তাদের কনটেন্ট একটি প্লাটফর্মে রাখবেন, দর্শক সরাসরি অর্থের বিনিময়ে সেই কনটেন্ট দেখতে পারবেন বা কিনে নিতে পারবেন। আমাজন, গুগল প্লে, আইটিউনস্, ভিমিও’র এই পদ্ধতি অনেক নির্মাতা বা প্রযোজকের কাছে জনপ্রিয়। দর্শক যতবেশি কনটেন্টটি দেখবেন বা কিনবেন নির্মাতা ততবেশি লাভবান হবেন। এটি এতই সম্ভাবনাময় যে একজন নির্মাতার কনটেন্ট যদি শক্তিশালী হয়-তাহলে লগ্নিকারী অর্থের কয়েকগুণ উঠে আসতে পারে।

এবার একটা উদাহরণ দেখা যাক-

ব্যঙ্গালোরের চলচ্চিত্রকার পবন কুমার, সম্প্রতি তার তৃতীয় সিনেমা ‘ইউ টার্ন’ নেটফ্লিক্সে বিক্রি করে দেন। শুধু তাই নয়- ‘ইউ টার্ন’ হচ্ছে এমন এক সিনেমা যার পুরো অর্থ নির্মাতা ক্রাউডফান্ডিং এর মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন। ছবির টাইটেলে যদি প্রযোজকের নামের পরিবর্তে দর্শক থাকে, তাহলে কেমন অনুভূতি হবে? পবন কুমারের প্রথম গণঅর্থায়নের সিনেমা লুসিয়া’র ট্রেইলারে দেখতে পাই ‘প্রডিউসড্ বাই দ্য অডিয়েন্স’।

পবন কুমার ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে-

ব্যাঙ্গালোরকে বলা হয় হলো ভারতের সিলিকন ভ্যালি। পবন কুমার পড়াশোনা করেছেন ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে। ফলে সিনেমা এবং প্রযুক্তিকে এক মাধ্যমে সংযুক্তি ঘটিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে অনেক সহজ করেছেন। তার প্রথম তিনটি সিনেমাই ক্রাউডফান্ডিং করে প্রযোজনা করা। প্রথাগত পদ্ধতির পাশাপাশি পরিবেশনার জন্য ব্যবহার করেন ডিজিটাল প্লাটফর্মকে। মাত্র ৭৫ হাজার ইউএস ডলারের সিনেমা ৬ লক্ষ ইউএস ডলার মুনাফা তোলে প্রথাগত পদ্ধতিতে, ১২ লাখ ইউএস ডলার পায় ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে। প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে নির্মাণ এবং তারকাবর্জিত চলচ্চিত্রের এমন সফলতা স্বাধীন ধারার নির্মাতাদের নতুন মাধ্যমে অর্থসংগ্রহ এবং পরিবেশনার জন্য একটি দিকনির্দেশনা।

বাংলাদেশে কী অবস্থা:

আশার কথা হলো- বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতারাও নতুন এসব মাধ্যম নিয়ে নিরীক্ষা করছেন অনেকেই। মোবাইল অপারেটরের অনলাইন প্লাটফর্মগুলো সম্প্রতি অরিজিনাল কনটেন্ট প্রযোজনা শুরু করেছে, যদিও সিনেমার প্রযোজনা সে অর্থে এখনও চোখে পড়েনি। হয়তো খুব সম্প্রতি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও দেখতে পাব। নেটফ্লিক্স এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ না করলেও অনেকেই এখন এর ভোক্তা হয়ে গেছেন। ক্রেডিট বা মাস্টার কার্ডের মাধ্যমে সাবস্ক্রাইবার হওয়া যাচ্ছে প্রাইম ভিডিও বা নেটফ্লিক্সে। বঙ্গবিডি, আইফ্লিক্স বা বায়োস্কোপও সম্প্রতি সাবস্ক্রিপশন পদ্ধতি চালু করেছে সীমিত আকারে।

গণ-অর্থায়ন এখন কতদূর:

তরুণরা যে গণ-অর্থায়ন পদ্ধতি রপ্ত করে নাই তা নয়। চলচ্চিত্রকার আবু সাইয়ীদ তাঁর ‘একজন কবির মৃত্যু’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন গণ-অর্থায়ন পদ্ধতিতে। পরবর্তীতে তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ খন্দকার সুমনের ‘সাঁতাও’ গণঅর্থায়ন করে নির্মাণ শুরু হয়। যদিও গণ-অর্থায়ন পদ্ধতিটির অর্থ সংগ্রহ পদ্ধতিগত কোনো উপায়ে ছিল না, সবাই তাঁর ব্যক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করেই অর্থ-সংগ্রহের কাজটি সম্পন্ন করেন। তবে সম্প্রতি উই আওয়ার্স সিনেমার ডাব্লিউএইচসি.ফান্ড (www.whc.fund) ক্রাউড ফান্ডিং প্লাটফর্ম নিয়ে আসে। বিকল্প পরিবেশনার পাশাপাশি এই সংগঠনটির ক্রিয়েটিভ ফান্ডিং প্লাটফর্ম (www.whc.fund) স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে বলে মনে করি।

লেখক: খন্দকার মো. জাকির, উদ্যোক্তা, উই আওয়ার্স সিনেমা