স্বপ্নপূরণের খোলা দুয়ার যখন ক্রাউড ফান্ডিং

২০১৫ সালের কথা। যুক্তরাজ্যের জোয়ান গার্নার, পরিচিত মহলে যিনি জো নামে পরিচিত, সিদ্ধান্ত নিলেন মাস্টার্স ক্লাসে ভর্তি হয়ে যাবেন। ছোটখাট গয়না বানানো এবং নকশা করাটা ছিল জো এর শখের মতো, আর সেই শখকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই গয়না আর ধাতব পদার্থের উপর উচ্চতর ডিগ্রী নেওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করা। কিন্তু বাধ সাধলো অর্থ।

কোর্স ফি’র অর্ধেক টাকাই তখনো যোগাড় হয়নি। মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার পাউন্ডের মতো ঘাটতি, এদিকে হাতে সময় মাত্র আট সপ্তাহ। অবসরপ্রাপ্ত বাবা-মা’র দ্বারস্থ হওয়াও সম্ভব না। জো’কে চিন্তা করতে হলো বিকল্প কিছুর। আর এই বিকল্প কিছুটাই ‘ক্রাউড ফান্ডিং’।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়া এবং জনগণের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মাধ্যমে শুরু হয় জো এর ক্রাউড ফান্ডিং যাত্রার। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে তিনি খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন, যে মানুষ ব্যাপারটিকে কিভাবে নিবে, আদৌ কেউ তার খরচ জোগাতে এগিয়ে আসবে কিনা। কিন্তু তার সমসাময়িক শিল্পীরা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে, ঐ সময়ে এটাই ছিল সবচেয়ে সঠিক পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের মতো একটি দেশে যেখানে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার পরই লোকের কাজকর্ম করে খাওয়া-পড়ার সমস্যা হয় না, সেখানে জো কেন গয়না নকশা নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিতে চান সে বিষয়ে তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। কেন লোকে আপনার পড়াশোনার খরচ দিবে, সেটি খুব ভালোভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হয়েছে। জো এসব প্রচারণা নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সাড়া পাওয়া শুরু করলেন  হঠাৎ করেই।

জো এর ভাষ্যমতে, “আমি খুবই ভাগ্যবান যে প্রথম অনুদান খুব দ্রুতই আসতে শুরু করলো। আমাকে চীন থেকে, আমেরিকা থেকে, নেদারল্যান্ডস- পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ অর্থ পাঠিয়েছে। মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আমার এতো ভালো লেগেছে! এই দেশে উচ্চতর পড়াশোনার এত খরচ, জন-বিনিয়োগ না পেলে আমার পড়াশোনাই হতো না।”

জো’কে যারাই অর্থ সাহায্য পাঠাতেন, তারাই তার নিজের হাতে বানানো একটি করে শিল্পকর্ম উপহার পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত জো সাড়ে চার হাজার পাউন্ড জোগাড় করেছিলেন, খণ্ডকালীন চাকুরী আর ছাত্রবৃত্তির টাকায় কোর্স ফি এর বাকিটাও উঠে গিয়েছিল। অতঃপর রয়্যাল কলেজ অব আর্টস থেকে গত বছর সেপ্টেম্বরে স্নাতকোত্তর শেষ করেন জো। লন্ডনে এখন নিজের একটি ল্যাব হয়েছে তার।

এরকম “দশে মিলে করি কাজ” কিংবা “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালি কণার” ভাবনাকে উপজীব্য করেই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের উৎপত্তি। ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সহায়তা প্রদানে অনীহা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সমস্যায় আশার আলো এনে দিয়েছিল ক্রাউড ফান্ডিং। এই বিকল্প অর্থায়নের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরাতন, ঘাটাঘাটি করলে পাওয়া যাবে অজস্র উদাহরণ। সেই ১৭৩০ সালে খোদ লন্ডন শহরের বণিক সমাজ ব্যাংক অফ লন্ডনকে রক্ষা করেছিল এরকম  সমধর্মী এক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। একবিংশ শতাব্দীতে এখন নতুন রূপে হাজির এই ক্রাউড ফান্ডিং। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমান অর্থ ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আজকাল খুবই পরিচিত একটি দৃশ্য- স্কুল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের কোনো এক অসুস্থ সহপাঠীর জন্য অর্থ সংগ্রহ, কিংবা শীত মৌসুম অথবা ঈদের সময় গরীব দুঃস্থদের সাহায্য করার জন্য অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। এর বাইরে এখন পর্যন্ত ক্রাউড ফান্ডিংয়ের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

অথচ শিল্প-সাহিত্যের জগতে এই ক্রাউড ফান্ডিং খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। সৃজনশীলতার সাথে অর্থযোগের সান্নিধ্য না ঘটায় এখনো এ দেশের অনেক প্রতিভা রয়ে গেছে অন্তরালে। অনেক পরিচালকের যত্নে গড়া পাণ্ডুলিপি আলোর মুখ দেখতে পায় না নতুন ছবির প্রযোজক পাওয়া যায় না বলে।  ক্রাউড ফান্ডিং সেক্ষেত্রে বিকল্প প্রযোজকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী কলকাতার কথাই ধরা যাক। ২০১৪ সালে দুই নাটক পাগল প্রবাসী বিজ্ঞানী একটা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শুরু করলেন প্রচারণা, শুরু হলো প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের কাজ।  প্রচারণার স্বার্থে তারা তাদের নাটকের প্রমোশনাল ভিডিও অনলাইনে ছেড়েছিলেন। এর মাধ্যমে যা তহবিল সংগ্রহ হয়, তা দিয়েই মঞ্চস্থ হয় ‘বৃষ্টি’ নাটকটির।

গত কয়েক বছরে চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট শিল্পী-পরিচালক-প্রযোজক গোষ্ঠীর  বাইরের লোকদের এই জগতে আনাগোনা বেড়েছে। কেউ হয়তো শখের বশে একটা-দু’টো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র কিংবা ডকুমেন্টারি বানাচ্ছেন, আবার তাদেরই মধ্যে কেউ কেউ এই পেশাটাকে প্রধান জীবিকা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। যেহেতু তথাকথিত মূলধারার বানিজ্যিক  চলচ্চিত্রের বাইরে দেশিয় চলচ্চিত্রের বাজারে লগ্নিকারী খুঁজে পাওয়া দুরূহ একটা বিষয়, তাই প্রযোজকদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। এই বিকল্প অর্থায়ন যেমন একদিকে পরিচালককে দিবে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষমতা, তেমনি শুধুমাত্র ব্যবসা সফল হয়ে ওঠার আবেদন নিয়ে নয়, বরং চলচ্চিত্রগুলো হয়ে উঠবে আক্ষরিক অর্থেই একেকটি স্বাধীন চলচ্চিত্র, বিশ্বভাণ্ডারের একেকটি সম্পদ।

ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মতো বিকল্পধর্মী উদ্যোগগুলো বেশ শ্রমসাধ্য, এবং এসব ক্ষেত্রে মানুষের কাছে পৌঁছাতে বেশ টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।  তবুও ক্রাউড ফান্ডিং কেন সময়ের প্রধানতম সম্ভাবনার একটি? প্রধান কারণ, এখানে বেশিরভাগ মানুষই আর্থিক সাহায্য করেন অনুদান হিসেবে, চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকাটাই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র প্রয়াস। অনুদানের বিপরীতে অধিকাংশ  লগ্নিকারীই ব্যবসায়িক দিক থেক  লাভের আশা করেন না। যে কারণে নির্মাতা এদিক থেকে থাকতে পারেন নির্ভার, স্বাধীন। তবে সবাই যে দাতাকর্ণ মহারাজ, তা-ও নয়। ক্রাউড ফান্ডিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও খুলে দেয়। লভ্যাংশ কিংবা সুদের বিনিময়েও ক্রাউড ফান্ডিংয়ে অনেকে লগ্নি করছেন, ভবিষ্যতে যা আরো প্রসারিত হবে বলে আশা করাই যায়।

ছবি: ১০ টাকা দিন সিনেমা বানাবো ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

সময়ের অন্যতম সম্ভাবনা হিসেবে দুয়ারে এসে কড়া নাড়ছে ক্রাউড ফান্ডিং। দৃশ্যতঃ এখনো ততোটা জনপ্রিয় না হলেও, দিনদিন বাড়ছে এর গ্রহণযোগ্যতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চত্বরের উপর পা ছড়িয়ে বসে থাকা একদল তরুণ, সামনে রাখা বক্সের উপর লেখা- “দশ টাকা দেন সিনেমা বানাবো”। চোখে এরকম স্বপ্ন নিয়ে ঘুরছে এরকম হাজারো তরুণ, একটি সিনেমা বানানোর জন্য ফিরছে দুয়ারে দুয়ারে, অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে হয়তো একদিন সত্যিই তাদের স্বপ্নের সিনেমা বানানো সম্ভব হবে। এরকম তরুণদের হাত ধরেই একদিন আমাদের চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে ক্রাউড ফান্ডিং। কে না জানে, বিপ্লব তো তরুণদের হাত ধরেই হয়!

লেখক, সৌরভ শাহরিয়ার, কমুনিকেশন অফিসার, উই আওয়ার্স সিনেমা